নারীবাদী, সুশীল সমাজসহ মানবতাবোধসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ নারীর অধিকার
আদায়, উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন নিয়ে বহুকাল আগ থেকে চেষ্টা চালিয়ে অনেকটা
সফলতার মুখ দেখলেও অনেকক্ষেত্রে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে বের হয়ে
আসতে পারেনি অনেক পুরুষই। মুখে জেন্ডার সংবেদনশীলতার কথা আওড়ালেও ব্যক্তি
জীবনে নারীর ওপর কর্তৃত্ব ফলানো, নির্যাতন করা, নারীর অধিকার ভূলুণ্ঠিত
করার ঘটনা অহরহ প্রতীয়মান হচ্ছে বিশ্বের সর্বত্র। উন্নয়নশীল ও অনুন্নত
বিশ্বের দেশগুলোতে সরাসরি নারীকে অধিকারবঞ্চিত ও মর্যাদাহানির ঘটনা বেশি
হলেও উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে নারীকে অবনমন করা হয় পরোক্ষভাবে। এক সময়
পুরুষরা পেশী শক্তির মাধ্যমে ও সামাজিক বিভিন্ন নিয়মকানুন আরোপ করার মধ্য
দিয়ে নারীদের ওপর নির্যাতনের খড়গ চালাত। পুরুষের নির্যাতনের যাঁতাকলে
পিষ্ট নারীরা অনেক সময় মানুষ হিসেবেই বিবেচিত হতো না। কিন্তু সময়ের
বিবর্তনে আর রাষ্ট্রীয় বিধি-নিষেধের কারণে অনেক পুরুষই ভদ্রতার মুখোশ পরে
আছে। নারীর ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় এখন অনেকে পেশী শক্তি প্রদর্শনের
পরিবর্তে সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে নারীকে অবদমিত করছে। নারীকে বিভিন্ন লোভের
ফাঁদে ফেলে নারীর মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করে নিজেদের কর্তৃত্ব স্থাপন করার
চেষ্টা করছে আমাদের সমাজের কিছু ভদ্রবেশী পুরুষ। পুরুষরা যেমন নানা ছলে বলে
কৌশলে নারীর ওপর কর্তৃত্ব স্থাপনের চেষ্টা করে তেমনি আবার অনেক নারী
নিজেদেরকে পুরুষদের অধস্তন হিসেবে ভাবতেই পছন্দ করে। এই কথা শুনে অনেক
নারীবাদী হয়ত রাগ করবেন কিন্তু সেই মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার
পরিবর্তনের পর থেকে এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ নারীই নিজেকে পুরুষের চেয়ে
দুর্বল মনে করে থাকে। গ্রামাঞ্চলের অশিক্ষিত নারীরা নিজেদের পুরুষের অধস্তন
ভাবে এটা যেমন সত্য তেমনি শহরাঞ্চলের অনেক শিক্ষিত নারীও নিজেদেরকে
পুরুষের ওপর সঁপে দিতে পছন্দ করে। এর মূল কারণ হলো দীর্ঘদিন ধরে লালিত
আমাদের সমাজ কাঠামো। আমাদের পারিবারিক প্রথা, রীতিগুলোই এমন যে, নারীর
সামাজিকীকরণ ঘটে নির্ভরশীল মন মানসিকতা সৃষ্টি করার মধ্যে দিয়ে। তবে এই
বিশ্বায়নের যুগে নারীর অধিকার মর্যাদা রক্ষার জন্য বিভিন্ন আইন, চুক্তির
কারণে নারীর অবস্থার উন্নতি ঘটছে। বর্তমান সমাজে বিশেষ করে শহরাঞ্চলে
শিক্ষিত মেয়েদের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়ে চলছে। ফলে নারী সমাজ নিজেদের অধিকার
আদায়ের জন্য সচেতন হচ্ছে। এতে পুরুষের পৌরষে কিছুটা আঘাত লাগছে। কিন্তু
ভদ্রবেশী পুরুষরা তো আর সরাসরি নারীকে অবদমিত ও অবমূল্যায়ন করতে পারে না।
তাই এই সকল পুরুষরা নারীর ওপর নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য বেছে
নিচ্ছে নিত্য নতুন চিত্তাকর্ষক ও উদ্ভট কৌশল, তৈরি করছে লোভনীয় অফারের
ফাঁদ। আর নারীরা পুরুষদের সেই ফাঁদে পা দিচ্ছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়,
পৃথিবীর সর্বত্রই নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে চিত্তাকর্ষক
বিজ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে। যে কোন পণ্যের বিজ্ঞাপনই হোক না কেন তাতে নারী থাকা
চাইই চাই। পুরুষদের সেভিং ক্রিমের বিজ্ঞাপনেও দেখা যায় নারীর সরব
উপস্থিতি। আমাদের দেশের বিজ্ঞাপনে যদিও নারীকে তুলনামূলক কম আবেদনময়ী
হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, ভারতের টিভি বিজ্ঞাপনগুলো দেখলে সত্যি মাথা গরম
হয়ে যাবে। সেগুলোতে নারীকে যৌন আবেদনময়ী হিসেবে তুলে ধরার প্রাণান্ত
চেষ্টা করা হয়। বিজ্ঞাপন নির্মাতারা চিন্তা করেন হয়ত নারীর এই রকম
উপস্থিতি বিজ্ঞাপনকে আর্কষণীয় করে তোলে। এর ফলে বিজ্ঞাপনটির প্রতি মানুষের
বেশি আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। যে পণ্যটির জন্য এই বিজ্ঞাপন সেই পণ্যটির কাটতিও
বেশি হয়। আসলে এখানে পণ্যটির থেকেও নারীর উপস্থিতিই মুখ্য হয়ে ধরা দেয়
যা প্রকৃতপক্ষে নারীকে পণ্য হিসেবে বিবেচনা করতে বাধ্য করে। পুরুষের
মানসপটে নারীর আবেদনময়ী ও প্রাণোচ্ছল ভঙ্গিমা এঁকে দিয়ে পণ্যের কাটতি
বাড়ানোর যে প্রচেষ্টা তা নারীর মর্যাদাকে লঘু করার অন্যতম উপায়। নারীর
সৌন্দর্যকে পুঁজি করে যে ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে তা কিন্তু পরোক্ষভাবে হলেও
নারীর জন্য মর্যাদা হানিকর। বলিউড, ঢালিউড অথবা টালিউড ফিল্ম
ইন্ড্রাস্ট্রির অধিকাংশ ফিল্মে পুরুষকে উপস্থাপন করা হয় দুর্জয়, দুসাহসী
হিসেবে আর নারীকে ফুটিয়ে তোলা হয় প্রেমময়ী ও ছিঁচকাদুনে হিসেবে।
বেশিরভাগ সিনেমাতেই দেখা যায় পুরুষরা লড়াই-সংগ্রাম করে, অন্যায়ের
বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, নারীকে ভালবাসে আর ভালবাসা পাওয়ার জন্য নানা
হিরোইজম দেখিয়ে নায়িকার মন জয় করে, নারী কোন বিপদে পড়লে বীর বেশে গিয়ে
নায়িকাকে বিপদ হতে উদ্ধার করে বুকে টেনে নেয় আর অন্যদিকে নারীরা পিতার
সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে না পেরে নিজের ভালবাসাকে আত্মাহুতি দেয়, নায়কের
ওপর সদা নির্ভরশীল নারীকে উপস্থাপন করা হয় প্রেমময়ী দুর্বলচিত্তের
অধিকারিণী হিসেবে। সিনেমাগুলোর এই দৃশ্যপট নারীকে খাটো করে দেখারই
নামান্তর। পুরুষরা শার্ট-প্যান্ট পরে পুরো ঢাকা থাকলেও নারীর পোশাক থাকে
অত্যন্ত ক্ষুদ্র। বরফের মাঝে শূটিংয়ের সময়ও দেখা যায় নারীর খোলামেলা
দেহ। এগুলো করা হয় মূলত সিনেমাগুলোতে একটু বাড়তি মসলা দেয়ার উদ্দেশ্য আর
দর্শকদের কাছে সিনেমাকে আর্কষণীয় করে তোলার জন্য। এটাও নারীকে খাটো করে
দেখার ও তাদেরকে পণ্য হিসেবে তুলে ধরার একটা প্রচেষ্টা। প্রকৃত পক্ষে
আমাদের ধ্যান-ধারণা এখনও নারীকে পণ্য রূপে চিন্তা করা। তবে হলিউডের কিছু
রোমান্টিক ও ঐতিহাসিক সিনেমা ব্যতীত অ্যাকশান ধর্মী মুভিতে নারীকে পুরুষের
সমকক্ষ হিসেবে তুলে ধরা হয়, নারীকে যোদ্ধা, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে
দেখানো হয়। কিন্তু এখানকার বিজ্ঞাপনগুলোতেও নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন
করা হয় নারীর অর্ধনগ্ন বা আবেদনময়ী অঙ্গ-ভঙ্গির চিত্র ধারণ করে। নারীকে
পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করার আরেকটি উপায় হচ্ছে বিভিন্ন ম্যাগাজিনের
প্রচ্ছেদে নারীকে রমণীয় ও চিত্তাকর্ষক হিসেবে ফুটিয়ে তোলা যা পুরুষের মনে
কামনার উন্মাদনা সৃষ্টি করে। এগুলোতে নারীকে যত নগ্নভাবে উপস্থাপন করা হয়
তত কাটতি বেশি থাকে। নারীরাও উপলব্ধি করতে পারে না যে আসলে তাদের
মর্যাদাকে এখানে হেয় করা হচ্ছে। সস্তা জনপ্রিয়তা ও অর্থের কাছে পরাভূত
নারীরা নিজেদের পোশাক খুলে পোজ দিতেও দ্বিধা করে না। এবার আসা যাক টিভি
চ্যানেলগুলোর সংবাদপাঠিকাদের কথায়। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলগুলোর অধিকাংশ
সংবাদ পাঠিকা সুন্দরী। এর কারণ যারা রূপবতী নয় তাদেরকে সংবাদপাঠের সকল
যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ দেয়া হয় না। এখানেও মূলত নারীকে মনোরঞ্জনের
সামগ্রী হিসেবে বিবেচনাই করা হয়। নারীকে শুধু টিভি পর্দায়, সিনেমাতেই
পণ্য হিসেবে তুলে ধরা হয় না, পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয় করপোরেট
অফিসগুলোতেও। এই জন্য দেখা যায় অধিকাংশ অফিসগুলোর রিসেপশনে সুন্দরীদের সরব
উপস্থিতি। আবার মোবাইল অপারেটারের ভয়েসের ক্ষেত্রে নারী কণ্ঠকেই
প্রাধান্য দেয়া হয়। এর কারণ নারীর সুরালো কন্ঠ হৃদয়ে ঝংকার তুলবে এই
চিন্তা হয়তো নিয়োগকর্তাদের মনে খেলা করে। একদিক বিবেচনায় এতে নারীদের
কর্মসংস্থান হচ্ছে। তারা স্বাবলম্বী হচ্ছে। ফলে তারা পরিবারে গুরুত্ব
পাচ্ছে। ক্ষমতায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যে মানসিকতা থেকে নারীকে
উপস্থাপন করা হচ্ছে তাতে নারী বিবেচিত হচ্ছে পণ্য হিসেবে। এটা
পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা বা পুরুষের নারীকে অবমূল্যায়নের এক সূক্ষ্ম কৌশল।
নারী সমাজের পুরুষের এই কূটকৌশল সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। নারী
চাকরি করবে, বিজ্ঞাপনে মডেল হবে, সিনেমা করবে কিন্তু এতে যেন কোন রকম
মর্যাদা ক্ষুণœ না হয় সেদিকে নারীকে খেয়াল রাখতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা
হলো, নারীর মর্যাদা রক্ষা করার জন্য পুরুষদের নারীকে পণ্য হিসেবে,
চিত্তাকর্ষক হিসেবে ব্যবহার করার মনমানসিকতা পরিত্যাগ করতে হবে এবং নারীকে
তার প্রাপ্য সম্মান দেয়ার মানসিকতা নিজের মধ্যে সৃষ্টি করতে হবে।
No comments:
Post a Comment
আপনার মন্তব্য দিন